এই ফল নিশ্চিত করে বলবো না যে সবাই চিনেন। কিন্তু এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি ফলটি অনেকের কাছে বেশ জনপ্রিয়। তবে এর গুনাগুন সম্পর্কে কি আমরা জানি? স্বল্প জ্ঞানে কিছুটা জানানোর প্রচেষ্টা মাত্র। লেখাটি পড়ে যদি কারো উপকার হয় তবেই আমার লেখা স্বার্থক।
রোজেলা নামের চেয়ে আমরা যারা গ্রামে বড় হয়েছি তাদের কাছে ফলটি চুকাই নামে বেশি পরিচিত। চুকাই বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় ফলগুলোর একটি। চুকাই বা চুকুর বা মেস্তা বা টক ফল যা ইংরেজিতে রোজেলা, রোজেল ও সরেল (roselle, sorell) নামে পরিচিত, (Hibiscus sabdariffa) একপ্রকার উপগুল্ম জাতীয় উদ্ভিদের ফল। ফলটি টক স্বাদযুক্ত, রঙ গাঢ় লাল। পৃথিবীর অনেক দেশেই এই গাছের বাণিজ্যিক চাষ করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশেও এই ফল পাওয়া যায়। ফেটে যায় ও বীজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমনঃ সিলেটে- হইলফা,খুলনায়- অম্বলমধু, ঢাকা ও মানিকগঞ্জে- চুকুল, কুমিল্লায়- মেডস নামে পরিচিত। এছাড়া চুকুর, চুকা চুকিকা, টেঙ্গাপাতা, চুকাপাতা ইত্যাদি নামেও পরিচিত। দেশে বিদেশে সবজি হিসেবে এর চাহিদা রয়েছে। মায়ানমারের সবচেয়ে জনপ্রিয় সবজিগুলোর একটি চুকাই।
টক স্বাদের কারনে জ্যাম, জেলি ও আচার তৈরিতে এই ফল ব্যবহার করা হয়। দেশে বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে এর পাতা ও ফল দিয়ে টক বা খাট্টা রান্না করে খাওয়া হয়। এর মধ্য “পেকটিন” আছে বলে জ্যাম তৈরিতে আলাদাভাবে পেকটিন মেশাতে হয়না। অস্ট্রেলিয়া, বার্মা, ত্রিনিদাদে জ্যাম তৈরিতে ব্যাপকভাবে এই ফলের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এই গাছের আঁশকে পাটের আঁশের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়। চুকাই এর বীজ থেকে ২০% ভোজ্যতেল উৎপাদন করা যায়।
এটি হালকা গোলাপী বর্ণের ফল, দেখতে অনেকটা ফুলের কলির মতো। মূলত বাংলাদেশে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান এলাকায় বেশি হয়। বিশেষ কিছু ভেষজ গুনাবলী থাকায় এর ব্যবহার বেশি হয়।
এই ফলের রয়েছে ঔষধি গুনাগুন
ইতালি,আফ্রিকা,থাইল্যান্ডে চুকাই পাতার ভেষজ চা খাওয়া হয়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রন, মূত্রবর্ধক, মৃদু কুষ্ট নরমকারী,হৃদরোগ, ক্যান্সার ও স্নায়ু রোগের চিকিৎসায় দীর্ঘকাল যাবত এর ব্যবহার লক্ষ করা যায়। চুকাইয়ের পাতা ও ফলে প্রচুর পরিমানে প্রোটিন, কেরোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ও অন্যন্য খাদ্য উপাদান রয়েছে। নিম্নে এর উপকারিতা গুলো আলোচনা করা হোল।
➤ ঠান্ডা কমায়, ওজন কমাতে সাহায্য করে
➤ হজমে সাহায্য করে
➤ টক স্বাদযুক্ত হওয়ায় এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’। এর টক স্বাদের জন্য একে ডাল, তরকারি বা মাছের রান্নায় ব্যবহার করা যায়।
➤ এর গোলাপী বর্ণটি মূলত অ্যান্থোসায়ানিন জন্য হয়ে থাকে যা ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রন করে, রক্তে চিনির পরিমান নিয়ন্ত্রন করে তাই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রন করে।
➤ ডি-টক্সিফিকেশন বা শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশনের বৈশিষ্ট থাকায় যকৃতের জন্য উপকারী।
➤মাসিকের সময় একজন মেয়ে বা নারীর হরমনের পরিবর্তনের কারনে হতাশা, হঠাৎ করে মন-মেজাজের রূপ পরিবর্তন এবং খাবার খাওয়ার অভ্যাস নিয়ন্ত্রনহীন হয়ে পড়ে তাই রোজেলা চা এই সময়টাই সবচেয়ে বেশি উপকারী। কিন্তু গর্ভাবস্থায় এই পানীয় পান করা যাবে না।
➤ অম্ল, বুকে জ্বালা-পোড়া, অ্যালার্জির সমস্যা থাকলে এই চা পান করা যাবে না।
এখন আমরা জেনে নিই এই ফলের কিছু ঘরোয়া ব্যবহার
রোজেলা চা তৈরির উপকরনঃ
➤ রোজেলা – ২ চামচ
➤ আদা কুচি- ১/২ চা চামচ
➤ পানি ২ কাপ
➤ মধু / গুড় ১ চা চামচ বা গুড় ১/২ চা চামচ
প্রস্তুত প্রণালীঃ
১। প্রথমে রোজেলা ফলগুলোকে ভালোভাবে ধুয়ে সুতির কাপড়ে বা তোয়ালেতে শুকিয়ে অন্য আরেকটা কাপড়ের উপর রোজেলা বীজ ফেলে শুধু পাপড়ি নিয়ে তা ভালোভাবে শুকাতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষন করার জন্য পাতলা নেটের ব্যাগে পাপড়িগুলো ২-৩দিন রোদে রেখে শুকাতে হবে। একবার ভালোভাবে শুকিয়ে গেলে শুকনো পাপড়িগুলো ‘রোজেলা চা’ বানানোর জন্য একদম তৈরী। পুরোপুরি শুকানোর পর রোজেলার পাপড়িগুলো কাচের জার –এ সংরক্ষন করলে সঠিক স্বাদ বজায় থাকবে।
২। একটি পাত্রে পানিতে আদা, রোজেলার পাপড়ি ২ চামচ দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে ১০মিনিট ধরে সিদ্ধ করতে হবে।
৩। এরপর পানির রং হাল্কা গোলাপী থেকে গাঢ় গোলাপী হয়ে উঠলে নামিয়ে নিতে হবে।
৪। স্বাদ অনুযায়ী মধু/ চিনি/ গুড় যোগ করে গরম গরম পরিবেশন করতে পারেন।
রোজেলা মাসালা চা তৈরির উপকরনঃ
➤ পানি ২ কাপ
➤ শুকনো রোজেলা ১ চা চামচ
➤ দারুচিনি ২টা
➤ এলাচ ২টা
➤ লবঙ্গ ৩-৪টা
প্রস্তুত প্রনালীঃ
একটি পাত্রে পানিসহ অন্য মসলাগুলো একে যোগ করে এর সাথে শুকনো রোজেলা যোগ করে ভালোভাবে ঢেকে ১০মিনিট ফুটিয়ে হালকা গোলাপী রং আসলে গরম গরম পরিবাশন করুন।
রোজেলার আচার তৈরির উপকরনঃ
➤ তেল ১ ১/২ চা চামচ
➤ পাঁচ ফোড়ন ১/৩ চা চামচ
➤ রোজেলা ২ কাপ
➤ (তাজা রোজেলা ভালোভাবে ধুয়ে তোয়ালেতে শুকিয়ে বীজ ফেলে শুধু খোসা নিয়ে নেওয়া হয়েছে)
➤ গুড় ২ কাপ ( রোজেলা যত কাপ গুড় তত কাপ)
➤ পানি ১/২ কাপ
➤ মরিচ গুড়া ১ চা চামচ
➤ আচারের মসলা ১ চা চামচ ( জিরা, ধনে, জায়ফল, জয়ত্রী, মরিচ গুড়া(শুকনা), গোলমরিচের গুড়া)
প্রস্তুত প্রনালীঃ
১। প্রথমে একটি পাত্রে তেল গরম করে তাতে পাঁচ ফোড়নের মসলা দিতে হবে, মসলা দেওয়ার পর আস্তে আস্তে নাড়তে হবে । মসলার চারদিকে বুদবুদ উঠা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
২।এরপর রোজেলা দিয়ে ৫মিনিট ভালোভাবে নাড়তে হবে, এর সাথে লবণ দিয়ে ভালোভাবে মেশাতে হবে।
৩।আস্তে আস্তে রোজেলা পাপড়ি গলে যাবে এবং মাঝে মাঝে নেড়ে দিতে হবে ।৪।পাপড়িগুলো গলে গেলে এর মধ্যে গুড় মেশাতে হবে। গুড়ের পরিমাণ রোজেলার পাপড়ির পরিমাণের সমান হবে অর্থ্যাৎ ১:১।
৪।গুড় গলে ভালোভাবে মিশে গেলে এর সাথে ১/২ কাপ পানি মেশাতে হবে, যেন রোজেলা ভালোভাবে সিদ্ধ হয়ে গেলে এটি গলে যাবে।
৫।কিছুক্ষন জ্বাল দেওয়ার পর মরিচ গুঁড়া মেশাতে হবে। এরপর এর সাথে ১ চা চামচ আচার মসলা মেশাতে হবে।
৬। এরপর একে ৮-১০ মিনিট ভালোভাবে নাড়তে হবে, যতক্ষন পর্যন্ত না পুরোপুরি গলে যাবে।
৭।এরপর একে ভালোভাবে ঠান্ডা করে কাচের জার (ভালোভাবে শুকনা এবং বাতাসে প্রবেশ করবেনা এমন জার) সংরক্ষন করতে হবে। যেন এর সঠিক স্বাদ বজায় থাকে।
৮।এভাবে এই আচারটি ৪-৫ মাস পর্যন্ত ভালোভাবে সংরক্ষন করা যায়।

0 মন্তব্যসমূহ